বাউলানি রূপে বিরাজিতা দেবী, প্রাগের এই পুজোয় মিলেমিশে একাকার সীমানা, সংস্কৃতির গণ্ডি

বাউলানি দুর্গার হাতে গানের অনুসঙ্গ হিসেবে উঠে এসেছে একতারা, দোতারা, করতাল, গমক ইত্যাদি। চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী প্রাগের টিবেট সেন্টার গ্যালারিতে দুর্গাপুজোয় এমনই আয়োজন। লিখলেন পাপিয়া মিত্র

মাটির রঙের গায়ের রং। দশ হাতে দশ রকমের বাউল বাদ্যযন্ত্র। দেবী এখানে বাউলানি রূপে বিরাজ করছেন। চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী প্রাগের টিবেট সেন্টার গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে অকাম ফেস্টিভ্যাল। সাত বছরে পড়ল এই পুজো। প্রতিষ্ঠাতা পূর্ণ দাস বাউলের শিষ্যা পাপিয়া ঘোষাল বাউল। প্রতিমা শিল্পী স্বয়ং পাপিয়া এবং সাত বছর ধরে তিনি গড়ে তুলছেন প্রতিমা।

এখানে দেবী দুর্গার যে রূপ তার কারণ জানতে শিল্পী পাপিয়ার সঙ্গে ফোনালাপ শুরু হল। নানা কথার সঙ্গে প্রশ্ন ছিল কলকাতায় বড়ো হয়েও কেন এত দূরের মাটিতে দুর্গাসন পেতেছেন? জানালেন, কলকাতার স্কুলে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে লন্ডনে যান আর্ট নিয়ে উচ্চশিক্ষা করতে। পরে সেখানেই থেকে যাওয়া ও নানা কাজে জড়িয়ে পড়া। বছর দশেক হয়েছে প্রাগে বাড়ি কিনে স্থায়ী বসবাস শুরু। সাত বছরে পড়ল তাঁর পুজো।

বাউল মন্ত্রে দীক্ষিত পাপিয়াকে বাবা (গুরু) পূর্ণ দাস বাউল বলেছিলেন প্রাগে কোনো পুজো হয় না। কুলীন ব্রাহ্মণকন্যার হাতে দেবী দুর্গার বোধন হোক। শোনা যায় কোনো এক বছর কেউ একজন দুর্গার পট পুজো করছিলেন। কিন্তু প্রথম ২০১৫-তে প্রতিমা নিজের হাতে গড়ে পুজো করেছিলেন পাপিয়া নিজেই। সেই পুজোতে উপস্থিত ছিলেন পূর্ণ দাস বাউল। প্রাগ শহরের সকল বাঙালিরা আসেন। পুজোটি মহিলা পরিচালিত। লন্ডন থেকে সন্ধ্যা ও সংগীতা গোস্বামী ( মা ও মেয়ে) এসেছেন পুজো করার জন্য। পাপিয়াকে সবরকম ভাবে সাহায্য করার জন্য এসেছেন লন্ডনবাসী চিত্রশিল্পী মিলি বসুরায়।

পুজো ঘিরে রয়েছে দু’টি প্রদর্শনী, একটি তন্ত্র ও অন্যটি উৎসব নামে। ইন্দো-চেক অটাম ফেস্টিভ্যাল শুরু হয়েছে ৯ অক্টোবর থেকে। উৎসবের সূচনা হয়েছে ইন্দো-চেক ছবি ‘প্রিবে তাণ্ত্রি’র স্ক্রিনিং দিয়ে। ‘তন্ত্র’ প্রদর্শনীর মূল ভাবনা শিব ও শক্তির প্রতি শ্রদ্ধা। ইতিমধ্যে ‘উৎসব’ প্রদর্শনী শুরু হয়ে গেছে। সেখানে দুর্গা সিরিজের ওপর প্রর্দশনী চলছে। বাহারিন, তিব্বত, মেক্সিকো, লন্ডন, দিল্লির শিল্পীদের কাজ প্রর্দশিত হয়েছে। দ্বিতীয় প্রর্দশনী চলবে একমাস।

অমিত শক্তির আধার দেবী দুর্গা এখানে একেবারেই এক আদিবাসী মা, তিনি তার সন্তানকে নিয়ে এসেছেন আমাদের আঙিনায়। অসুরকে দেখানো হয়েছে বাউল আধ্যাত্মিকতার কাছে নিবেদিত এক প্রাণ। পাশাপাশি কুমোরটুলি থেকে আনা হয়েছে ছোট্ট দেবী দুর্গা। আদিবাসী জীবন জীবিকা নিয়ে শিকড়ের গভীরে ফিরে যাওয়াই শিল্পীর শিল্পকর্ম। তাই শিল্পী পাপিয়া ৮ মাস প্রাগ- এ থাকলেও বাকি ৪ মাস ফিরে আসেন ভারতের মাটিতে। কলকাতায় থাকেন। গ্রামেগঞ্জে চলে যান বাউল আখড়ায়। লোকশিল্পী পাপিয়া শিক্ষা নেন তাঁদের যাপন থেকে কথা, সুর, মননশক্তি। জ্ঞান অর্জনের ঝুলি ভরেন এই ভাবেই। তাই যখনই দুর্গা গড়েন তখন তাকে নিরস্ত্র রাখেন। নারীশক্তির অস্ত্র এখানে জ্ঞান, এখানে গান। তাই বাউলানি দুর্গার হাতে গানের অনুসঙ্গ হিসেবে উঠে এসেছে একতারা, দোতারা, করতাল, গমক ইত্যাদি।

শুধু সংস্কৃতের মন্ত্র উচ্চারণ নয়। রীতিমত ঢাকঢোল, কাঁসর ঘণ্টার সঙ্গে খাওয়াদাওয়া, নাচগান, সিঁদুরখেলা সবই চলবে। শুধু চেকনিবাসী ভারতীয় নয় ইরান, সিরিয়া, আফগানিস্তান, বাংলাদেশের মানুষের যোগদান পুজো আখড়াকে রঙিন করে তোলে।

আরও পড়ুন: এ বার উমার ফেরার পালা, কোভিডবিধি মেনেই বিসর্জন



from KhaborOnline https://ift.tt/3n1XdHk

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Top Post Ad

Below Post Ad

Tech Posts